May 26, 2020, 2:27 am

News Headline :
গাবতলীতে বিপ্লবের উদ্যোগে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ গাবতলী বাগবাড়ীতে নগদঅর্থ ও ত্রান সামগ্রী বিতরণ গাবতলীর ১০নং বালিয়াদিঘী ইউনিয়ন পরিষদে উন্মুক্ত বাজেট ঘোষনা টঙ্গীতে র‍্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে শিশুধর্ষণের প্রধান আসামী নিহত সহকর্মীরাই হত্যা করে সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলী দেলোয়ারকে মানিকগঞ্জে জেলা আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধ লীগের সাধারন সম্পাদক এ এইচ এম আব্দুল কাদেরের সহযোগিতায় সদস্যদের মাঝে নগদ অর্থ প্রদান রাজধানীর মিরপুরে ২০১৩ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ বাস্তবায়ন কমিটির সংবাদ সম্মেলন দেশে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ শনাক্ত, সর্বোচ্চ মৃত্যু পার্বতীপুরে শিশু কন্যাকে ধর্ষন চেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার -১ পার্বতীপুরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিক্ষার্থীর মাঝে বাই সাইকেল বিতরণ
করোনা এবং ফেলে আসা আমার প্রিয় মানুষেরা ।।। প্রথম পর্ব

করোনা এবং ফেলে আসা আমার প্রিয় মানুষেরা ।।। প্রথম পর্ব

Spread the love

—বিশ্বনাথ মিত্র (আসানসোল, পশ্চিম বাংলা)

দর্শনা বর্ডার হয়ে অবশেষে বাংলাদেশে প্রবেশ করলাম ৷
এক আকাশ এক মাটি একই জল টলমল
তারকাঁটায় বাঁধা তুই মাগো
তবু যে একই তনু এ অবিরল
বয়ে যায় স্নিগ্ধ-তাপ সবুজ ফসল ৷
একটি ছোট্ট অফিসঘরে আমাদের তিনজন ভারতীয় অর্থাৎ সাংবাদিক পুলক বসু, কবি রাজু শেখ, কবি দুর্গা বেরা এবং আমাকে বসিয়ে, হন্তদন্ত হয়ে যে অতি সাধারণ ছা-পোষা মুসলিম লোকটি গরম লাল চা এনে বলল, ‘আগে খাইয়া লন হেরপরে ইমিগ্রেশন লইয়া কাম করেন ৷’ ওর আর্থিক অবস্থা যা দেখেছিলাম, ভাল একটা মাস্ক পড়ার ক্ষমতাও নেই ৷ করোনার থাবা কি ওইসব এলাকায় হানা দিয়েছে ? ও ভাল আছে ? দর্শনার বর্ডার সিল করে দেওয়া হয়েছে ৷ সারা বাংলাদেশে মত দর্শনাতেও লকডাউন জারী হয়েছে ৷ রোজগারপাতি সব বন্ধ ৷ পরিবার সামলে ওই দিন আনি দিন খাই লোকটি কী করে আহার সংকুলান করবে !

টাঙ্গাইল যাবার জন্য দর্শনা রেল স্টেশনের দিকে রওনা দিলাম ৷
বাংলাদেশের সিম নিতে হবে কোন পরিচিত-র আই ডি-র মাধ্যমে ৷ ভাবলাম, সেই ঢাকা যাবার আগে ফোনের সিম পাবার সৌভাগ্য নেই কপালে ৷ এদিকে ফোন ছাড়া এক মুহূর্তও আমার চলে না ৷ কী করি ! দর্শনা স্টেশনের ধারে মোবাইলের একটি রি-চার্জের দোকানে মনের কষ্ট খুলে বললাম ৷ কারণ ফেসবুক ওয়াটসআপ ছাড়া আমার জীবন জলহীন মৎস ৷ দোকানের মালিক আমার অবস্থা বুঝতে বোধহয় পেয়েছিলেন ৷ নিজের নামে অতিরিক্ত একটি বাংলাদেশের সিম দিয়ে বললেন, ‘পারলে ফেরার সময় ফেরত দিয়ে যাবেন ৷’ ফিরেছি বেনাপোল হয়ে ৷ সিমটা আমার কাছেই রয়ে গেছে ৷ কার্যত বাংলাদেশের মানুষদের সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন একে দিয়েই শুরু হয়েছিল ৷
ও ভাল আছে ?

যাব দর্শনা হ’তে ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল রেলপথে ৷ বাংলাদেশের প্রকৃতির কী অপরূপ সৌন্দর্য, ইতিমধ্যে তার সামান্য ঝলক লক্ষ্য করেছি স্টেশনে আসতে আসতে ৷ সুতরাং চিত্রা এক্সপ্রেসে যেতে যেতে বাইরের দৃশ্যাবলীর মোহ কে আর ছাড়তে চায় !
পদ্মা, যমুনার বিপুলা জলধারা পায়ের নীচ দিয়ে বহে যাবে, ভাবতেই গা টা শিরশির করে উঠল ৷ কিন্তু এ কী ! আমার বসার সিট যে জানালার ধারে নেই ৷ যে আছে,বয়স ২২ এর যুবক ৷ কাতারে পড়াশুনা করে ৷ নাম আবিদ হোসেন ৷ ২ বছর পর বাড়ি ফিরছে ৷ মাঝে মাঝেই ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলছে ৷ বাবা ছোট বেলায় মারা গেছে ৷ বিধবার প্রদীপের শেষ সলতে আবিদ ৷ অনুরোধ করলাম, যদি ও সিটটা ছেড়ে দেয় ৷ বলামাত্র হাসিমুখে জানালার ধারে সিট ছেড়ে দিল ৷ সে কী অনির্বচনীয় দৃশ্য ! শুভ্র বকের ডানার মত সবুজ মাঠ বৃক্ষরাজি পাল্লা দিয়ে বিপরীতপানে ছুটে চলেছে ৷ খাল বিল জানা অজানা কত নদী, গঞ্জ, শহর-গ্রাম ৷ অন্যদিকে পাশের যুবকটির ভিতর ভারত সম্পর্কে কত কৌতূহল কত ভালবাসা লক্ষ্য করছি ৷ উত্তেজিত হয়ে মাকে ফোনে বলছে, জানো, আমার পাশে ইন্ডিয়ান আঙ্কল ! হঠাৎ দেখি মস্ত একখানা পেয়ারা কিনে আমার হাতে ধরিয়ে দিল ৷ কিছুতেই পয়সা নিল না ৷ আচ্ছা, আবিদ যে বলল, কাতার থেকে এসেছে, করোনা কি কাতারে আঘাত হেনেছিল ? কিছু ক্ষতি হয়নি তো ? ও যে মায়ের একমাত্র শেষ সম্বল ৷
টাঙ্গাইল স্টেশনে আমাদের সাদরে রিসিভ করলেন ভূঞাপুরের কবি হারুন অর রশিদ এবং প্রাবন্ধিক মামন তরফদার ৷ তার পরের চব্বিশ ঘন্টা ছিল আমার জীবনের অন্যতম ভাল লাগার সময় ৷
ভূঞাপুরের ইব্রাহিম কলেজ মাঠে
পরদিন সকালে স্থানীয় কবি লিমা রহমান এর কাব্যগ্রন্থ উন্মোচন অনুষ্ঠান ৷ রাতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল ভূঞাপুরের ডাক বাংলোয় ৷ খাওয়া-দাওয়ার কী এলাহি বন্দোবস্ত ৷ হারুন ভাইরা আমাদের নিয়ে কী করবে ভেবে পাচ্ছেন না ৷ কখনো পুলিশের বড় কর্তা কখনো উপজেলা নির্বাহী আধিকারিকের সংগে পরিচয় করানো… অফুরন্ত আবেগে ফুটছিল মামন ভাইয়েরা ৷ আমি জানি ওই পুলিশ অফিসার খুব ছোটাছুটি করছেন লকডাউনকে সফল করার জন্য ভুঞাপুরের মানুষজনও আমাদের আসানসোলের বাঙালিদের মত আড্ডাপ্রিয় ৷ সামলানো অনেক ঝক্কির ৷ উপজেলা নির্বাহী আধিকারিক নাসরিন পারভিন তাঁর ছোট কন্যা শিশুকে সামলে ভুঞাপুরকে বাঁচাতে কী প্রাণপাত পরিশ্রম করছেন, আমরা ছাড়া আর কে জানবেন ? এই অঞ্চলও যে তাঁর মাতৃভূমি ৷ আমাদের প্রতি তাঁর হৃদয়খচিত আপ্যায়ন জীবনে ভুলতে পারব না ৷
অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে আরও এক অনন্য অভিজ্ঞতা ৷ আমাদের নিয়ে ওখানকার সাহিত্য পাঠক লেখক লেখিকা বিশেষত তরুণ কবিদের কী উন্মাদনা ! হঠাৎ একটি ফুটফুটে সুন্দরী তন্বী এসে বলল, ‘দাদা আপনার অটোগ্রাফ চাই ৷’ চমকে উঠলাম ৷ পঞ্চাশোর্দ্ধ জীবনে জানতে পারলাম আমার স্বাক্ষর এত দামী ৷ নামটিও ততোধিক সুন্দর ৷ হাসান মেহেজাবিন ৷ কবি এবং চিত্রশিল্পী ৷ বলাবাহুল্য এখানে ছোট বড় নির্বিশেষে সবাই একে ওপরকে ‘দাদা’ বলে সম্ভোধন করেন ৷ খুব চিন্তা হচ্ছে, আমার মেয়ের মত স্টাইল বজায় রাখতে গিয়ে মেহেজাবিন যদি মুখে মাস্ক না পড়ে ! রাশেল খান ও সাম্য দুজনেরই বয়স কম ৷ প্রথমজন ছড়াকার, অন্যজন গদ্যকবি ৷ দুজনেই কবিতার ভিতর দিয়ে ভিন্ন জগতে পাড়ি দেয় ৷ সেদিনই দেখছিলাম তাদের প্রাণস্ফুর্তির উদ্দামতা ৷ ছেলেদুটো যেন কবিতার নেশায় খোলা আকাশের নিচে না বসে ! কবি সৈয়দ মেহেদি হাসান কি এখনও চোখের গভীরতা নিয়ে কোন কবিতা রচনায় মগ্ন ? মানব জীবনের সংকটকে কীভাবে অনুরণিত করবে তার কাব্যে ! কবি লিমা সেদিন মেসেজ করে বলেছিলেন, গলায় ব্যাথা, সর্দি,কাশি ৷ চিন্তিত হয়ে পড়েছিল ৷ ‘আমাকে করোনা ধরেনি তো ?’ একধমক দিই ৷ ‘সর্দি জ্বর মানেই করোনা নয় ৷ মাস্ক পড়ুন ৷ আলাদা রুমাল, তোয়ালে ব্যবহার করুন, নিজেকে আলাদা রাখুন আর একবার ডাক্তার দেখিয়ে নিন ৷’ সত্যি, চারদিকে এত গুজব, মানুষ আতঙ্কে পড়ে যাচ্ছে ৷
দুই বাংলার যুগ্ম সাহিত্যসভায় সভাপতি ছিলেন শংকর দাস ৷ বয়স সত্তর উর্ত্তীণ ৷ করোনা সংক্রামক বেশি বয়স এবং কম শিশুদের কাছে বেশি ভয়ের ৷ উনি যেন না বেরোন বাইরে ৷ কিন্তু কথা কি আদৌও শুনবেন ? সারা ভুঞাপুরের মানুষকে প্রতিদিন তাঁর না দেখলে ভাত হজম হয় না ৷ কবি হারুনের সন্তানও ছোট ৷ খুব সাবধানে থাকতে হবে ৷
৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে ভূঞাপুরের অন্যতম সৈনিক সৈয়দ জিয়াউল হক ৷ আমার প্রথম দেখা কোন মুক্তিযুদ্ধের নায়ক ৷ উনি বয়স্ক হলেও এখনো টগবগে যুবক তাঁর আচরণে ৷ কিন্তু তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে আরও এক যুদ্ধ ৷ শত্রু অতিমারী করোনা ৷ একটু সাবধানতা অবলম্বন করলেই মুক্তিযুদ্ধের মত এই অসম যুদ্ধেও তিনি জিততে পারবেন ৷

প্রায় আটদিন ঢাকার ফকিরাপুলে ‘আসর’ নামে একটি মাঝারি মানের হোটেলে ছিলাম ৷ হোটেলের স্টাফেরা আমাকে খুব শ্রদ্ধা করত ৷ বিশেষত ওদের কাছে কবি লেখকেরা খুব সম্মানের বস্তু ৷ বলত, ‘দাদা, আপনি বড় ভাল মানুষ ৷’ একদিন সামনের রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির জন্য হোটেলে দীর্ঘক্ষণ জল আসেনি ৷ অবাঞ্ছিত ক্রোধে ওদের যথেষ্ট বকাবকি চিৎকার করি ৷ ভারতে বহু হোটেলে অনেক সময় এই জাতীয় সমস্যায় অনেকবার পড়েছি ৷ অনেক হোটেল থেকে বলে দেয়, পছন্দ না হলে অন্য হোটেল দেখুক কিংবা পাল্টা তর্ক ৷ আর এরা কী ম্যানেজার কী স্টাফ সবাই তো বেজায় কাঁচুমাচু ! পরের দিন উপলব্ধি করলাম, এত রেগে যাওয়া আমার মোটেও উচিত হয়নি ৷ যাই, একবার ওদের সংগে সময় কাটিয়ে আসি ৷ যেতেই ম্যানেজার রাজু ভাসা ভাসা চোখে বলে উঠল, ‘দাদা কাইল আপনারে খুব কষ্ট হচ্ছিল বুইঝাছি ৷’ ঘরবাড়ি সব ছেড়ে কত কম বয়স থেকে সামান্য কিছু রোজগারের আশায় হোটেলে কাজ করছে ৷ একটা ঘরে একসাথে রাতে ঘুমায় ৷ সামাজিক দূরত্ব কী করে বজায় রাখবে ? কিন্তু আরও চিন্তার বিষয়, হোটেল বন্ধ হওয়াতে বাড়িতে ফিরে যাবার সম্ভবনা ৷ সামান্য বেতনে জমা টাকা আর কতটুকু ! ক’দিনই বা চলবে ?

ঢাকায় প্রথমদিনই আমরা গেলাম দক্ষিণ প্রান্তে বনশ্রী নামক জায়গায় ৷ দুই বাংলার কবিদের সাক্ষী রেখে জন্ম নিল ‘কবিতা কিরণ’ সাহিত্যসংস্থা ৷ কবিতা গান সাহিত্য আলোচনার সঙ্গে আমাদের দেওয়া হবে সম্বর্ধনা ৷ কবি মহম্মদ শাহানুর ইসলাম, কবি প্রতিবাদী জাইদুল ইসলাম, কবি শাহিন খানদের ভালবাসা ওই কয়েকঘন্টায় আমাদের সারা শরীর ভিজিয়ে দিল ৷ জাইদুলের বয়স অল্প ৷ কাব্য প্রকাশনার কাজে সদা নিয়োজিত থাকে ৷ থাকুক না এই কয়েকদিন ঘরবন্দী হয়ে ৷ কেন্দ্রীয় শীর্ষস্থানীয় নেতা চোদ্দ দলের জোট শরিকের মহাসচিব মুহাম্মদ আতাউল্লাহাখান ছুটে এসেছিলেন আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে ৷ এত উঁচু পদে আছেন, অথচ কী অমায়িক ৷ উনি নিশ্চয় গরীব মানুষের ত্রাণের জন্য চারদিক ছুটছেন ৷ মন যে বড়ই উদার ৷ কিন্তু যাই করুন, সাবধানতা অবশ্যই অবলম্বন যেন করেন ৷ এ রোগ যে নিচু উঁচু ভেদাভেদ দেখে আসে না ৷ এধরনের নেতারাই তো বাংলাদেশে নিরপেক্ষতার ভিত অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে আসছেন ৷ ওই দেশ কেন, বাঙালি সত্ত্বা বজায় রাখেতে তাঁকে আমাদের বড়ই প্রয়োজন ৷

ক্রমশ—

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com