May 26, 2020, 3:04 am

News Headline :
গাবতলীতে বিপ্লবের উদ্যোগে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ গাবতলী বাগবাড়ীতে নগদঅর্থ ও ত্রান সামগ্রী বিতরণ গাবতলীর ১০নং বালিয়াদিঘী ইউনিয়ন পরিষদে উন্মুক্ত বাজেট ঘোষনা টঙ্গীতে র‍্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে শিশুধর্ষণের প্রধান আসামী নিহত সহকর্মীরাই হত্যা করে সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলী দেলোয়ারকে মানিকগঞ্জে জেলা আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধ লীগের সাধারন সম্পাদক এ এইচ এম আব্দুল কাদেরের সহযোগিতায় সদস্যদের মাঝে নগদ অর্থ প্রদান রাজধানীর মিরপুরে ২০১৩ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ বাস্তবায়ন কমিটির সংবাদ সম্মেলন দেশে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ শনাক্ত, সর্বোচ্চ মৃত্যু পার্বতীপুরে শিশু কন্যাকে ধর্ষন চেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার -১ পার্বতীপুরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিক্ষার্থীর মাঝে বাই সাইকেল বিতরণ
করোনা এবং ফেলে আসা আমার প্রিয় মানুষেরা… ( ৩য় পর্ব )

করোনা এবং ফেলে আসা আমার প্রিয় মানুষেরা… ( ৩য় পর্ব )

Spread the love

—বিশ্বনাথ মিত্র (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)

সকাল থেকে সময় পাচ্ছিলাম না ৷ চায়ের তৃষ্ণা মেটাতে সুকুমার রায়ের বেচারা পথিকের মত ‘অবাক জলপান’ এর মত ঘুরছি ৷ এত বড় ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস, যেন ”ঢাকার ভিতর দেখ আর একটা ঢাকা ৷”

‘আপনার সামনেই তো ক্যান্টিন ৷’ একজনের কথায় সম্বিত ফিরল ৷ ক্যান্টিনটা দেখে অবাক হয়ে গেলাম ৷ বড় বড় গাছের ছায়ায় একতলা বেশ একটি বড় বিল্ডিং ৷ সারা ইউনিভার্সিটি এরিয়াটাই অবশ্য সবুজঘেরা ছোট বড় বৃক্ষ সমাহারে স্নিগ্ধ রূপ ধারণ করে মনের ভিতর চুটিয়ে প্রেম করছে ৷ যাই হোক, ভিতরে প্রবেশ করতেই মনে হল ফিরে গেছি প্রায় তিরিশ বছর আগে চেনা অন্য এক ক্যান্টিনের গহ্বরে ৷ ৷ হ্যাঁ, আমার প্রিয় সেই কলকাতার রবীন্দ্রভারতীর ক্যান্টিন ৷ অনেকদিন হোয়াইটওয়াশ না হওয়া প্রশস্ত হলঘর ৷ সারি সারি বেঞ্চ লাগানো বেশ কয়েকটি খাবার টেবিল ৷ একপ্রান্তে কিচেন-কাউন্টার ৷ অবশ্য খাবার বলতে চপ, চা, পাউরুটি জাতীয় ৷ দুপুরে লাঞ্চের ব্যবস্থা আছে কিনা বোঝা গেল না ৷ স্টুডেন্টদের ইতঃস্তত কলরব ৷ দুই একজন আলাদা আলাদা বসে থাকলেও বেশিরভাগ নির্দিষ্ট এক একটি টেবিল দখল করে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে ৷ হঠাৎ মনে হল, আরে ওই তো আমার ক্লাসমেট অরিন্দম ! নিটোল ঢলঢলে মুখের ওই সীমান্তি আসছে না ? সদ্য বিবাহিত ওই মেয়েটি আমাদের কাকলি, তাই তো ?
ঘোর কাটল ভেসে আসা জোর কলরবে ৷ চোখ চলে গেল সামনের কাঠের বড় টেবিলের দিকে ৷ চারপাশ ঘিরে বসে আছে গোটা দশ বার স্টুডেন্ট ৷ কী বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে জোর তর্ক করছে ৷ সকলেই পড়ুয়া ৷
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারদিকে লাল কৃষ্ণচূড়ায় মনটি আসন্ন বসন্তের নিরাভরণ হাতছানিতে উড়ুউড়ু করছিল ৷ তার’পর এই নিষ্পাপ মুখগুলি আমার সদ্য প্রৌঢ়ত্বকে মেজেঘষে চকচকে তারুণ্যে পরিণত করে তুললো যেন ৷ কৌতূহলে গুটিগুটি পায়ে ওদের সামনে গিয়ে বললাম, ‘তোমাদের একটা গ্রুপ ফটো নিতে পারি ?’ মূহূর্তে ওরা চুপ হয়ে গেল ৷ ‘মানে, আপনি কে বুঝতে পাচ্ছি না যে !’ পরিচয় দিতেই সকলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল ৷ ‘বসুন দাদা, আমাদের কী সৌভাগ্য আপনি আমাদের জাতীয় কবির দেশের মানুষ ৷’ প্রসঙ্গত বলে রাখি, কবি নজরুলের শহর আসানসোল-চুরুলিয়ার বাসিন্দা হবার সুবাদে সর্বত্র ভি আই পি সম্মান পেয়ে এসেছি ৷ সুযোগ বুঝে ‘undue advsntage’ নিতেও কার্পণ্য করিনি ৷ সে গল্প না হয় পরে বলব ৷
ছেলেগুলোর পরিচয় পেয়ে তো চমকে উঠলাম ৷ শাসকদল আওয়ামী লীগের ছাত্র ইউনিয়ন সারা বাংলাদেশ ছাত্র লীগের বাঘা বাঘা নেতা এক একজন ৷ সামনে বসে লীগের সাধারণ যুগ্ম সম্পাদক প্রদীপ চৌধুরী, প্রশিক্ষণ সম্পাদক হায়দার মহম্মদ জিতু সহ অন্যান্য সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দ ৷
অদ্ভূত এক শিহরণ জাগছিল মনে ৷ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম একটি ছাত্র সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সংগে বসে আছি ৷ মানসচক্ষে ভেসে উঠল ষাট সত্তর দশকের রক্তমাখা দিনগুলো ৷ এই ছাত্রলীগ এবং তাদেরই ভ্রাতৃপ্রতিম গঠন ডাকসু না থাকলে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হত কিনা বলা সম্ভব হবে না ৷ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর যাদের নেতৃত্বে দেশব্যাপি আন্দোলনে পর মুক্তি লাভ করেন মুজিব ৷ যাদের ডাকে দশ লক্ষ জনতা কুড়ি লক্ষ হাত তুলে ‘৭১ এ
সোহরাওয়ার্দী ময়দানে ২৩ ফেব্রুয়ারী মুজিবকে বঙ্গবন্ধু আখ্যা দেয় ৷ যাদের রক্তে বারবার ঢাকা বরিশাল খুলনার রাজপথ পাকিস্থানীদের হাতে রক্তাক্ত হয়েছে ৷
কলেজে একসময় চুটিয়ে বাম ছাত্র রাজনীতি করেছি ৷ সুতরাং তারুণ্যের এই উচ্ছ্বলতা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে লাগলাম ৷ কিছুদিন নকশাল রাজনীতিতে জড়িয়ে গিয়েছিলাম ৷ সেসময় অবশ্য সত্তরের বিপ্লবের অগ্নিঝরা আন্দোলন থিতিয়ে গেছে ৷ সংসদীয় বামদের রমরমা আধিপত্য ৷ কিন্তু কোথায় যেন অধুরা সেই সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন স্বাধীন বাংলাদেশের ভিতর কায়া লাভ করেছিল ৷
লক্ষ্য করলাম, ভারতের রাজনীতি, NRC CAA নিয়ে বেশ ওরা ওয়াকিবহাল ৷ এ’সময়ে ভারতে NRC -র বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছিল ৷ আমি জানি, এ ব্যাপারে ভিতরে ভিতরে বাংলাদেশেহ মুসলমান সমাজ তথা সাধারণ নাগরিকদের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছিল ৷ নিজে থেকে NRC প্রসঙ্গ উঠালাম ৷ ওরা বিষয়টি ভারতের বলে এড়িয়ে গেল ৷ বুঝলাম, গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা না থাকলে এহেন “নীরব প্রতিক্রিয়া” পাওয়া সম্ভব নয় ৷ ইতিমধ্যে ওদের দৌলতে আরও একবার লিকার চা গলাধঃকরণ করা হয়ে গেছে ৷ কয়েকমিনিটের মধ্যে ওরা বড় আপন করে নিল আমায় ৷ বিশেষত মহম্মদ জিতু ৷ রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্য সম্বন্ধে অগাধ জ্ঞান ৷ নিজে নাট্যকর্মী শুধু নয়, প্রচুর নাটকের বইও লিখেছেন ৷ পরে এরা আমাকে একুশে বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী চত্বরে সম্বর্ধনাও দেয় ৷ সেটি জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি ছিল ৷ কথা হল মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র লীগ ডাকসুর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে ৷ আওয়ামী লিগের শাখা সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও সরকারের কঠোর সমালোচনা করতে পিছপা নয় ৷ যা আমাদের দেশে অপ্রতুল ৷ ভারত সম্বন্ধে অগাধ শ্রদ্ধা এদের অন্তর-স্থলে ৷ কিন্তু মমতা ব্যানার্জী তাদের পছন্দের তালিকায় এক নন্বর হলেও তাঁর প্রতি সামান্য অভিমান, তিস্তা নদীর জল কি আর একটু বেশি পাওয়া যায় না ? বড় কষ্ট যে কৃষকদের ৷ আর ওরাই তো সৃষ্টিকর্তা এই বিশ্বমানবে ৷ আর এখন তো এই কৃষির বিষয়ে আমাদের বিশেষ নজর দেওয়া আবশ্যক ৷ করোনা পরবর্তী বিশ্বে বিশেষত তৃতীয় দুনিয়ার দেশে পুঁজি নির্ভর শিল্পমণ্ডলে কী ক্ষুদ্র কী বৃহৎ সব জায়গায় বিরাট আঘাত হানবে ৷ তখন এই কৃষিশিল্প ভারত বা বাংলাদেশের কাছে বড় সুযোগ অর্থনৈতিক মানচিত্রে নিজেদের টি আর পি বাড়িয়ে নেওয়ার ৷ ভারতের স্বাভাবিক বন্ধু ভারত ৷ তথাকথিত হিন্দুরাষ্ট্র নেপালেও চীনা হাত বাড়িয়েছে ৷ পাকিস্থান ছেড়েই দিই, শ্রীলংকাতেও তামিল প্রশ্নে ভারতবিরোধী হাওয়া মাঝে মাঝেই বয়ে যায় ৷ সেক্ষেত্রে ভারতের একমাত্র স্বাভাবিক বন্ধু বাংলাদেশ ৷ তার উন্নতি পারস্পরিক সম্পর্কের ভিতটিকেই শক্তপোক্ত করে তুলবে ৷
ছেলেমেয়েগুলোকে যা দামাল দেখেছিলাম, কী এক বস্তিতে কারা যেন সরকারী ক্ষতিপূরণ পায়নি বলে,সরেজমিন সমীক্ষা করতে দল বেঁধে যাবে এখনই ৷ অগত্যা আমাকেও উঠতে হল ৷ আমি নিশ্চিত ওরা রিলিফের কাজে সারা বাংলাদেশ ছোটাছুটি করছে ৷ আর হ্যাঁ, এও আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি যথেষ্ট সুরক্ষাকবচ নিয়েই এই সামাজিক কাজগুলো করছে ৷ ওরাই যে আগামী পৃথিবীর আদর্শের আইকন ৷

ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস আরও একবার দেখব বলে মনঃস্থির করলাম ৷ আর্টস ফ্যাকাল্টির বিল্ডিং বিরাট অঞ্চল জুড়ে ৷ হবেই বা না কেন,এদেশে রবীন্দ্র নজরুলের সাহিত্যবৃক্ষ বছরের পর বছর বাংলাভাষার ফুল ফল প্রদান করে আসছে ৷ মাঝে বিরাট ময়দান ৷ খেলা হচ্ছে না ৷ তবে লাল রঙের ইউনিভার্সিটির নিজস্ব বাস পরপর দাঁড়িয়ে ৷ এত বড় ইউনিভার্সিটি, একদিনে একে আয়ত্ত্ব করা অসাধ্য ৷ সোহওরাবর্দী ময়দান থেকে শহীদ মঞ্চ, বাংলা একাডেমি চৌহাদ্দি ছাড়িয়ে নীলক্ষেত জুড়ে দেশের সর্ব প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৩টি অনুষদ, ৮৩টি বিভাগ, ১২টি ইনস্টিটিউট এবং ৫৬টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের থাকার জন্যে রয়েছে ২০টি আবাসিক হল ও ৩টি হোস্টেল।
“নাম : বিশ্বনাথ মিত্র ৷ নিবাস : আসানসোল ৷ সাক্ষাতের উদ্দেশ্য : সৌজন্যমূলক ৷” চিরকুটটি পৌঁছে দিতে উপাচার্য সংগে সংগে তাঁর চেম্বারে প্রবেশের অনুমতি দিলেন ৷ উপাচার্য মোঃ আখতারুজামন শুধু একজন পণ্ডিত ব্যক্তি নন, অতি সজ্জন ব্যক্তি ৷ শুরুতেই বললেন, ‘আমি আপনার শহর আসানসোল চিনি ৷’
আমি তো বেজায় অবাক ৷
‘বছরখানেক আগে আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংগে কাজী নজরুল ইউনিভার্সিটিতে যাই ৷’
মনে পড়ে গেল আসানসোলের ওই ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ সাম্মানিক প্রদান করা হয়েছিল ৷ নিজেকে গর্বিতবোধ করছিলাম ৷ এরপর উনি উপস্থিত অন্যান্য বিষয়ের ডিনদের সংগে আলাপ করিয়ে দেন ৷ সামান্য একজন শিক্ষক হয়ে এত সম্মান পাব, কল্পনাতীত ছিল ৷

চলবে…

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com