August 5, 2020, 7:40 am

করোনা এবং ফেলে আসা আমার প্রিয় মানুষেরা… ( ৩য় পর্ব )

করোনা এবং ফেলে আসা আমার প্রিয় মানুষেরা… ( ৩য় পর্ব )

Spread the love

—বিশ্বনাথ মিত্র (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)

সকাল থেকে সময় পাচ্ছিলাম না ৷ চায়ের তৃষ্ণা মেটাতে সুকুমার রায়ের বেচারা পথিকের মত ‘অবাক জলপান’ এর মত ঘুরছি ৷ এত বড় ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস, যেন ”ঢাকার ভিতর দেখ আর একটা ঢাকা ৷”

‘আপনার সামনেই তো ক্যান্টিন ৷’ একজনের কথায় সম্বিত ফিরল ৷ ক্যান্টিনটা দেখে অবাক হয়ে গেলাম ৷ বড় বড় গাছের ছায়ায় একতলা বেশ একটি বড় বিল্ডিং ৷ সারা ইউনিভার্সিটি এরিয়াটাই অবশ্য সবুজঘেরা ছোট বড় বৃক্ষ সমাহারে স্নিগ্ধ রূপ ধারণ করে মনের ভিতর চুটিয়ে প্রেম করছে ৷ যাই হোক, ভিতরে প্রবেশ করতেই মনে হল ফিরে গেছি প্রায় তিরিশ বছর আগে চেনা অন্য এক ক্যান্টিনের গহ্বরে ৷ ৷ হ্যাঁ, আমার প্রিয় সেই কলকাতার রবীন্দ্রভারতীর ক্যান্টিন ৷ অনেকদিন হোয়াইটওয়াশ না হওয়া প্রশস্ত হলঘর ৷ সারি সারি বেঞ্চ লাগানো বেশ কয়েকটি খাবার টেবিল ৷ একপ্রান্তে কিচেন-কাউন্টার ৷ অবশ্য খাবার বলতে চপ, চা, পাউরুটি জাতীয় ৷ দুপুরে লাঞ্চের ব্যবস্থা আছে কিনা বোঝা গেল না ৷ স্টুডেন্টদের ইতঃস্তত কলরব ৷ দুই একজন আলাদা আলাদা বসে থাকলেও বেশিরভাগ নির্দিষ্ট এক একটি টেবিল দখল করে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে ৷ হঠাৎ মনে হল, আরে ওই তো আমার ক্লাসমেট অরিন্দম ! নিটোল ঢলঢলে মুখের ওই সীমান্তি আসছে না ? সদ্য বিবাহিত ওই মেয়েটি আমাদের কাকলি, তাই তো ?
ঘোর কাটল ভেসে আসা জোর কলরবে ৷ চোখ চলে গেল সামনের কাঠের বড় টেবিলের দিকে ৷ চারপাশ ঘিরে বসে আছে গোটা দশ বার স্টুডেন্ট ৷ কী বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে জোর তর্ক করছে ৷ সকলেই পড়ুয়া ৷
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারদিকে লাল কৃষ্ণচূড়ায় মনটি আসন্ন বসন্তের নিরাভরণ হাতছানিতে উড়ুউড়ু করছিল ৷ তার’পর এই নিষ্পাপ মুখগুলি আমার সদ্য প্রৌঢ়ত্বকে মেজেঘষে চকচকে তারুণ্যে পরিণত করে তুললো যেন ৷ কৌতূহলে গুটিগুটি পায়ে ওদের সামনে গিয়ে বললাম, ‘তোমাদের একটা গ্রুপ ফটো নিতে পারি ?’ মূহূর্তে ওরা চুপ হয়ে গেল ৷ ‘মানে, আপনি কে বুঝতে পাচ্ছি না যে !’ পরিচয় দিতেই সকলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল ৷ ‘বসুন দাদা, আমাদের কী সৌভাগ্য আপনি আমাদের জাতীয় কবির দেশের মানুষ ৷’ প্রসঙ্গত বলে রাখি, কবি নজরুলের শহর আসানসোল-চুরুলিয়ার বাসিন্দা হবার সুবাদে সর্বত্র ভি আই পি সম্মান পেয়ে এসেছি ৷ সুযোগ বুঝে ‘undue advsntage’ নিতেও কার্পণ্য করিনি ৷ সে গল্প না হয় পরে বলব ৷
ছেলেগুলোর পরিচয় পেয়ে তো চমকে উঠলাম ৷ শাসকদল আওয়ামী লীগের ছাত্র ইউনিয়ন সারা বাংলাদেশ ছাত্র লীগের বাঘা বাঘা নেতা এক একজন ৷ সামনে বসে লীগের সাধারণ যুগ্ম সম্পাদক প্রদীপ চৌধুরী, প্রশিক্ষণ সম্পাদক হায়দার মহম্মদ জিতু সহ অন্যান্য সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দ ৷
অদ্ভূত এক শিহরণ জাগছিল মনে ৷ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম একটি ছাত্র সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সংগে বসে আছি ৷ মানসচক্ষে ভেসে উঠল ষাট সত্তর দশকের রক্তমাখা দিনগুলো ৷ এই ছাত্রলীগ এবং তাদেরই ভ্রাতৃপ্রতিম গঠন ডাকসু না থাকলে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হত কিনা বলা সম্ভব হবে না ৷ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর যাদের নেতৃত্বে দেশব্যাপি আন্দোলনে পর মুক্তি লাভ করেন মুজিব ৷ যাদের ডাকে দশ লক্ষ জনতা কুড়ি লক্ষ হাত তুলে ‘৭১ এ
সোহরাওয়ার্দী ময়দানে ২৩ ফেব্রুয়ারী মুজিবকে বঙ্গবন্ধু আখ্যা দেয় ৷ যাদের রক্তে বারবার ঢাকা বরিশাল খুলনার রাজপথ পাকিস্থানীদের হাতে রক্তাক্ত হয়েছে ৷
কলেজে একসময় চুটিয়ে বাম ছাত্র রাজনীতি করেছি ৷ সুতরাং তারুণ্যের এই উচ্ছ্বলতা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে লাগলাম ৷ কিছুদিন নকশাল রাজনীতিতে জড়িয়ে গিয়েছিলাম ৷ সেসময় অবশ্য সত্তরের বিপ্লবের অগ্নিঝরা আন্দোলন থিতিয়ে গেছে ৷ সংসদীয় বামদের রমরমা আধিপত্য ৷ কিন্তু কোথায় যেন অধুরা সেই সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন স্বাধীন বাংলাদেশের ভিতর কায়া লাভ করেছিল ৷
লক্ষ্য করলাম, ভারতের রাজনীতি, NRC CAA নিয়ে বেশ ওরা ওয়াকিবহাল ৷ এ’সময়ে ভারতে NRC -র বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছিল ৷ আমি জানি, এ ব্যাপারে ভিতরে ভিতরে বাংলাদেশেহ মুসলমান সমাজ তথা সাধারণ নাগরিকদের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছিল ৷ নিজে থেকে NRC প্রসঙ্গ উঠালাম ৷ ওরা বিষয়টি ভারতের বলে এড়িয়ে গেল ৷ বুঝলাম, গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা না থাকলে এহেন “নীরব প্রতিক্রিয়া” পাওয়া সম্ভব নয় ৷ ইতিমধ্যে ওদের দৌলতে আরও একবার লিকার চা গলাধঃকরণ করা হয়ে গেছে ৷ কয়েকমিনিটের মধ্যে ওরা বড় আপন করে নিল আমায় ৷ বিশেষত মহম্মদ জিতু ৷ রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্য সম্বন্ধে অগাধ জ্ঞান ৷ নিজে নাট্যকর্মী শুধু নয়, প্রচুর নাটকের বইও লিখেছেন ৷ পরে এরা আমাকে একুশে বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী চত্বরে সম্বর্ধনাও দেয় ৷ সেটি জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি ছিল ৷ কথা হল মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র লীগ ডাকসুর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে ৷ আওয়ামী লিগের শাখা সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও সরকারের কঠোর সমালোচনা করতে পিছপা নয় ৷ যা আমাদের দেশে অপ্রতুল ৷ ভারত সম্বন্ধে অগাধ শ্রদ্ধা এদের অন্তর-স্থলে ৷ কিন্তু মমতা ব্যানার্জী তাদের পছন্দের তালিকায় এক নন্বর হলেও তাঁর প্রতি সামান্য অভিমান, তিস্তা নদীর জল কি আর একটু বেশি পাওয়া যায় না ? বড় কষ্ট যে কৃষকদের ৷ আর ওরাই তো সৃষ্টিকর্তা এই বিশ্বমানবে ৷ আর এখন তো এই কৃষির বিষয়ে আমাদের বিশেষ নজর দেওয়া আবশ্যক ৷ করোনা পরবর্তী বিশ্বে বিশেষত তৃতীয় দুনিয়ার দেশে পুঁজি নির্ভর শিল্পমণ্ডলে কী ক্ষুদ্র কী বৃহৎ সব জায়গায় বিরাট আঘাত হানবে ৷ তখন এই কৃষিশিল্প ভারত বা বাংলাদেশের কাছে বড় সুযোগ অর্থনৈতিক মানচিত্রে নিজেদের টি আর পি বাড়িয়ে নেওয়ার ৷ ভারতের স্বাভাবিক বন্ধু ভারত ৷ তথাকথিত হিন্দুরাষ্ট্র নেপালেও চীনা হাত বাড়িয়েছে ৷ পাকিস্থান ছেড়েই দিই, শ্রীলংকাতেও তামিল প্রশ্নে ভারতবিরোধী হাওয়া মাঝে মাঝেই বয়ে যায় ৷ সেক্ষেত্রে ভারতের একমাত্র স্বাভাবিক বন্ধু বাংলাদেশ ৷ তার উন্নতি পারস্পরিক সম্পর্কের ভিতটিকেই শক্তপোক্ত করে তুলবে ৷
ছেলেমেয়েগুলোকে যা দামাল দেখেছিলাম, কী এক বস্তিতে কারা যেন সরকারী ক্ষতিপূরণ পায়নি বলে,সরেজমিন সমীক্ষা করতে দল বেঁধে যাবে এখনই ৷ অগত্যা আমাকেও উঠতে হল ৷ আমি নিশ্চিত ওরা রিলিফের কাজে সারা বাংলাদেশ ছোটাছুটি করছে ৷ আর হ্যাঁ, এও আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি যথেষ্ট সুরক্ষাকবচ নিয়েই এই সামাজিক কাজগুলো করছে ৷ ওরাই যে আগামী পৃথিবীর আদর্শের আইকন ৷

ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস আরও একবার দেখব বলে মনঃস্থির করলাম ৷ আর্টস ফ্যাকাল্টির বিল্ডিং বিরাট অঞ্চল জুড়ে ৷ হবেই বা না কেন,এদেশে রবীন্দ্র নজরুলের সাহিত্যবৃক্ষ বছরের পর বছর বাংলাভাষার ফুল ফল প্রদান করে আসছে ৷ মাঝে বিরাট ময়দান ৷ খেলা হচ্ছে না ৷ তবে লাল রঙের ইউনিভার্সিটির নিজস্ব বাস পরপর দাঁড়িয়ে ৷ এত বড় ইউনিভার্সিটি, একদিনে একে আয়ত্ত্ব করা অসাধ্য ৷ সোহওরাবর্দী ময়দান থেকে শহীদ মঞ্চ, বাংলা একাডেমি চৌহাদ্দি ছাড়িয়ে নীলক্ষেত জুড়ে দেশের সর্ব প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৩টি অনুষদ, ৮৩টি বিভাগ, ১২টি ইনস্টিটিউট এবং ৫৬টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের থাকার জন্যে রয়েছে ২০টি আবাসিক হল ও ৩টি হোস্টেল।
“নাম : বিশ্বনাথ মিত্র ৷ নিবাস : আসানসোল ৷ সাক্ষাতের উদ্দেশ্য : সৌজন্যমূলক ৷” চিরকুটটি পৌঁছে দিতে উপাচার্য সংগে সংগে তাঁর চেম্বারে প্রবেশের অনুমতি দিলেন ৷ উপাচার্য মোঃ আখতারুজামন শুধু একজন পণ্ডিত ব্যক্তি নন, অতি সজ্জন ব্যক্তি ৷ শুরুতেই বললেন, ‘আমি আপনার শহর আসানসোল চিনি ৷’
আমি তো বেজায় অবাক ৷
‘বছরখানেক আগে আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংগে কাজী নজরুল ইউনিভার্সিটিতে যাই ৷’
মনে পড়ে গেল আসানসোলের ওই ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ সাম্মানিক প্রদান করা হয়েছিল ৷ নিজেকে গর্বিতবোধ করছিলাম ৷ এরপর উনি উপস্থিত অন্যান্য বিষয়ের ডিনদের সংগে আলাপ করিয়ে দেন ৷ সামান্য একজন শিক্ষক হয়ে এত সম্মান পাব, কল্পনাতীত ছিল ৷

চলবে…


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com