July 9, 2020, 7:58 pm

News Headline :
ভোলায় সাপের কামড়ে এক নারীর মৃত্যু সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে রায়গঞ্জ উপজেলা মডেল প্রেস ক্লাব উদ্বোধন এই তোমার পৃথিবী! ———– সাম্য র‌্যাব-১ গাজীপুর ক্যাম্পের অভিযানে রাজধানী গাবতলী এলাকা হতে অপহৃত ভিকটিমকে ১২ ঘন্টা পর মুমূর্ষ অবস্থায় উদ্ধার আশুলিয়ায় অবৈধ গ্যাস বিস্ফোরণে ৩ জনের মৃত্যু; ইউপি মেম্বার সহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা ম্যাজিস্ট্রেটের বিয়ের সংবাদে স্ত্রীর স্বীকৃতি দাবি তিন নারীর! সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যু টঙ্গীতে রহস্যজনক কারণে স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর হতে ০১(এক) জন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার চতুর্থ বারে করোনা পজিটিভ ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট বলসোনারো
করোনা এবং ফেলে আসা আমার প্রিয় মানুষেরা… —বিশ্বনাথ মিত্র

করোনা এবং ফেলে আসা আমার প্রিয় মানুষেরা… —বিশ্বনাথ মিত্র

Spread the love

( ৪র্থ পর্ব )
পরিচিত তরুণ কবি হাসান নাশিদ সকালে ফোন করে সাবধান করে বলেছিলেন, একুশে ফেব্রুয়ারী ভাষাদিবসের জন্য অফিস দোকানপাট সব বন্ধ ৷ আজ প্রচণ্ড ভীড় হবে ৷ মেট্রো রেলের খোঁড়াখুঁড়ির ফলে ঢাকার রাস্তাঘাটও এমনিতে প্রচণ্ড জ্যাম থাকে ৷ পনেরো মিনিটের পথ পেরোতে লাগে পাক্কা এক ঘন্টা ৷ সূর্যাস্তের অনেক আগে তাই বেরিয়ে পড়লাম বইমেলার উদ্দেশ্যে ৷

দোয়েল চত্বরের কাছে এসে চক্ষু চড়কগাছ ৷ দেখি বইপ্রেমীর দল পিলপিল করে বিশ্ববাদ্যালয় প্রাঙ্গণের দিকে চলছে ৷ অবিরাম জনস্রোত ! রিক্সাওয়ালা জানাল, ‘বাকী পথটুকু বাবু আপনারে হেঁইটা যাতে হবে ৷’
সত্যি, ভীড় হবেই বা না কেন ? দিনটি যে একুশে ফ্রেবুয়ারী ৷ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তূর্যবাহক ৷ বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সেরা উৎসব ৷ সকালে ভাষাদিবস উদযাপন করে ঢাকার মানুষের ঠিকানা এখন বিকালের এই বইমেলা ৷ হয়ত সবাই সে অর্থে পাঠক নয়, কিন্তু অমর একুশে বইমেলার সংগে তাদের আ মরি বাংলাভাষার অনির্বচনীয় ভাবাবেগ জড়িয়ে ৷ আশ্চর্য তৃপ্তি লক্ষ্য করছিলাম মানুষগুলির চোখেমুখে ৷

অদ্ভুত এই দেশ বাংলাদেশ ৷ এখানে মুসলিম জনজাতির ৯৯ ভাগ মানুষের মধ্যে ধর্মের প্রাবল্য মাত্রাতিরিক্ত ৷ হিন্দুদের ভিতর অতখানি নেই ৷ দুটি ধর্মের এহেন বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যের কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করে বলেছিলেন, একটি জাতির অভিমুখ প্রবল ধর্মীয় আবহে,অন্য জাতিটির অভিমুখ কুসংস্কারে ৷ তিনি দুঃখ করে বলেন, একজনের দরজা যেখানে বন্ধ, অন্যের দরজা সেদিক খোলা ৷ আবার অন্যের যেদিক খোলা, আর একজনের কাছে সেখানে বন্ধ দুয়ার ! অত্যাশ্চর্য যে, বিপরীত এই সত্তাটুকুকে নসাৎ করে অধুনা বাংলাদেশের সার্বজনীন শ্রেষ্ঠ উৎসব ইদুজ্জোহা কিংবা দুর্গাপুজো নয় ৷ শ্রেষ্ঠ উৎসব হল একুশে ফেব্রুয়ারীর মহান ভাষা দিবস ৷ সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মাতৃভাষার প্রতি এ জাতীয় টান শুধু বাংলাদেশের শিক্ষিত নেটিজেন নয়, অতি সাধারণ মানুষের অন্তরেও সমভাবে বহমান ৷ এখানে প্রেমের কথা হয় একুশের সুগন্ধে ৷ একুশে মানুষকে স্বপ্ন দেখায় ৷ মানুষকে ভালবাসতে শেখায় ৷

ফকিরাপুলে যে আবাসিক হোটেলে ছিলাম, বা পার্শ্ববর্তী যেসব রেষ্টুরেন্টে আহার করতাম, গত দু’দিন ধরে মালিক থেকে কর্মচারী সকলে আজকের দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছে ৷ সকলের কাছে যেন এক অনাবিল উৎসবের মেজাজ ৷ শুধু ঢাকা শহর নয়, বাংলাদেশের বরিশাল, টাঙ্গাইল, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা সর্বত্র ভাষাদিবসকে গানে কবিতায় মিছিলে প্রার্থনায় বরণ করতে মাসাধিক কাল থেকে প্রস্তুতি নিয়েছে ৷ ধর্মকে পিছনে ফেলে সকলের অজ্ঞাতে টপকে গেছে মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসার আকুল আকাঙ্খা ৷ বাস্তবিক বাংলাদেশে আমার আসার পিছনে একুশের ভাষাদিবস প্রত্যক্ষ করার তাগিদটাই বেশী কাজ করেছিল ৷

গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোটস গ্রাউন্ড চত্বর দিয়ে এক পরিচিতির বাড়ি নিমন্ত্রণ খেয়ে ফিরছিলাম ৷ দেখেছিলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার যাবার রাস্তায় বেশ কিছু মানুষ পুষ্পস্তবক, মালা হাতে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ৷ রাত ন’টা হবে ৷ সারা জায়গাটায় বাংলাদেশ পুলিশের কড়া পাহারা ৷ ওইসব মানুষ রাতেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মঞ্চে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ৷ অবশ্য ঠিক রাত ১২ টা বাজলে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী ও মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রথম ফুল দেবেন ৷ তারপর সকলের পালা ৷ হোটেলে ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, এই বাঙালি জাতি বাংলাভাষার জন্য গর্বিত নাকি বাংলাভাষা গর্বিত এহেন মাতৃভাষা-পাগল বাঙালির জন্য ?

আজ ভোরে স্নান করে এবং নতুন পোষাক পরিধান করে দোয়েল চত্বরের কাছে যখন এলাম, হালকা শীতের মৃদুমন্দ হাওয়ায় মন বড়ই উৎফুল্ল হয়ে উঠল ৷ পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ালাম দোয়েল চত্বরের পশ্চিম প্রান্তে অন্যতম ভাষাশহীদ রফিক উদ্দীন আহমদের স্মরণে স্মৃতিসৌধের সামনে ৷ মনে হল সপ্তমীতে দুর্গাঠাকুরের আরাধনা বুঝি শুরু ৷ রফিকসৌধটিকে পিছনে ফেলে ইউনিভার্সিটি স্ট্রীট ধরে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে ৷ মূল শহীদ মিনার এখান থেকে চারশো মিটারের মত হবে ৷ পাকা রাস্তার মাঝখানে ডিভাইডারে নানা রঙের ফুলের বাহার ৷ কামিনী, নীল অপরাজিতা, হলদে গাঁদা কী নেই ? দুধারে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সুদৃশ্য বিল্ডিং উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে ৷ হঠাৎ এক অস্ফুট কোলাহল ভেসে এল ৷ পিছন ফিরে দেখি ছোট একটি মিছিল তাদের সংগঠনের ফেস্টুন এবং বিরাট ফুলের স্তবক সামনে রেখে নিঃস্তব্দে এগিয়ে আসছে ৷ মিছিলটিকে পথ দিতে সরে দাঁড়ালাম ৷ পরক্ষণে আবার দেখি ওদের পিছনে আরও একটি দলবদ্ধ মানুষের মিছিল ৷ তার পরে আরও একটি ৷ নানাবিধ কর্মচারী সংগঠন, সাহিত্যসংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, ভাষা পরিষদ, নামী অনামী রাজনৈতিক দল কারা উপস্থিত নেই এইসব মিছিলবর্গে ? যদিও অনেকে আমার মত বিচ্ছিন্নভাবে ভাষাদিবস দেখতে আসছে, তবু নিজেকে খুব একাকীত্ব বোধ করতে লাগলাম ৷ ওইসব মিছিলের সংগে কি পায়ে পা মেলানো যায় না ? মজার ব্যাপার, পরমূহূর্তে যে কাকতালীয়ভাবে মনের অভিলিপ্সা পূরণও হয়ে যাবে, ভাবিনি ৷ পায়ে পা মিলিয়ে যেতে দেখি বাংলাদেশের জাতীয় আইন কমিশনের সুদৃশ্য একটি মিছিলে আমি কখন মিশে গেছি ৷ আমার অনাহূত যোগদানকে বাধা দিতে চেষ্টা করেছিল সংগে থাকা নিরাপত্তা কর্মীরা ৷ সেটি লক্ষ্য করে আমায় সাদরে টেনে নিলেন মিছিলের বিচারক সদস্যরা ৷ আজ যে প্রাণের মেলা. বাংলা ভাষার আত্মিক মেলবন্ধন ৷ সেই মিছিলের মধ্যমণি ছিলেন জাতীয় আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সাবেক সর্বোচ্চ বিচারপতি মাননীয় ফইলুক হক ৷ শুভ্র পরিহিত কুর্তা পাঞ্জাবীতে সৌম্য,শান্ত, স্থিতধী ৷ সুযোগ বুঝে একপ্রস্থ আলাপ সেরে ফেললাম ৷ আবেগে ভাসতে ভাসতে কখন যে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এসে পৌঁছে গেছি, বুঝতে পারিনি ৷

বিশাল শহিদ মিনারটিকে সাজানো হয়েছে হাজার হাজার ফুল ও ফুলের স্তবকে ৷ ততক্ষণে হাজারখানেক মানুষ চর্তুদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে মহান এই দিনটিকে স্মরণ করার জন্য ৷ এসব প্রত্যক্ষ করে কোন মাকে তার সন্তান বলতেই পারে, সব তীর্থ বারবার একুশের শহীদ মিনার একবার ৷ শুধুমাত্র মাতৃভাষার জন্য এত এত আবেগ ! হৃদয়ে লুকিয়ে এত সহস্র ফাগুন ! আসলে এটি স্বীকৃত সত্য যে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনই এই দেশের সাধারণ জনগণকে প্রথমবাবের মত তাঁদের সত্যিকার জাতীয় পরিচয় সম্পর্কে সচেতন করে, যা ১৯৭১-এ এসে পরিণতি লাভ করেছিল ৷ একুশের ভাষা আন্দোলন এই দেশের সর্বস্তরের মানুষের আশা আকাঙ্খা ও স্বপ্নপূরণের বার্তা ৷

অগুনতি মানুষ শোকাশ্রু, আনন্দাশ্রু নিয়ে অবিরাম চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে ৷ কাল রাত থেকে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি, কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবিসহ সারা ঢাকা ২১ ফেব্রুয়ারীর শহীদ বরকত রফিকদের স্মরণে এখানে জড়ো হয়েছেন ৷ এত ভিড়, তবু জট নেই বিশৃঙ্খলা নেই ৷ নীরবে এসে, শ্রদ্ধা জানিয়ে ফিরে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ ৷ কিছু কপোত কপোতি হাত ধরাধরি করে ইতঃস্তত ঘুরছিল ৷ আর কিছু কমবয়সী যুবক যথারীতি আড্ডা দিয়ে যাচ্ছে ৷ তবে সকলে যে খুশীর জোয়ারে ভাসছে, বলার অপেক্ষা রাখে না ৷ চতুর্দিক থেকে মানুষের ঢল বাড়ছিল ৷ মিছিলে মিছিলে একাকার একুশের মহান শহীদ মিনার !

শুধু কি বাংলাদেশ ? মাতৃভাষার ঐতিহ্যের এই উৎসব টেনে এনেছে সারা বিশ্বকে আজ ৷ কলকাতা, মুম্বাই এমন কী সুদূর ইংল্যান্ড থেকেও ভাষাপ্রেমী মানুষ এই দিনটির সাক্ষী হতে হাজির ৷ জীবনের সেরা সামাজিক উৎসব আজ দেখলাম ৷ যে উৎসবের জন্য প্রাণ দেওয়া যায়, প্রাণ সৃষ্টি হয় ! মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠায় বাহান্ন’র লড়াই ছিল একটি আপাতশান্ত জাতির শৃঙ্খলামুক্ত করার রসদ মুক্তিযুদ্ধের রক্তঋণে ৷ এরই মধ্যে কোলাহলমুখর একদল ছাত্রী আমার নজর কেড়ে নিল ৷ ওরা শহীদ মিনার মঞ্চের সামনে আঙিনার একটি অংশ ফুলের সজ্জায় সুরভিত করে তুলেছে ৷ সামনে যে পুষ্পস্মারক অর্ঘ্য দেখা যাচ্ছে, তাদেরই সৃজনী ৷ সেটিকে সামনে রেখে ওদের ব্যাকুলতা, গর্ব ৷ যখন শুনল আমি ওদের জাতীয় কবির দেশের মানুষ, সে কী চোখে মুখে বিস্ময় ! এরা সকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ গার্ল গাইডস এসোসিয়েশনার ছাত্রী ৷ কন্যাসম মেয়েদের আব্দারে শহীদ মিনারের সামনে গ্রুপ ফটোও তুললাম ৷
আগামীবছর আবার আসব, এ’কথা বলে, বীর শহীদদের পুণ্যভূমিতে মাথা ঠেকিয়ে ছিলাম ৷ কিন্তু করোনা নামক যে ভয়াবহ হানাদার আজ মানব সভ্যতাকে খাদের অতলান্তে নিয়ে গেছে, সেখানে আগামীদিনগুলির ভবিষৎই বা কী ভাবে নির্ধারণ করব ?

বেশিরভাগ মানুষ শ্রদ্ধা জানিয়ে ফিরে যাচ্ছিল ৷ আমার মন কিন্তু চাইছিল না শহীদ মিনার ত্যাগ করতে ৷ এদিকে বেশ খিদে পেয়েছে ৷ আবার ফিরে এলাম রফিক স্মৃতিসৌধ মঞ্চের ধারের রাস্তায় ৷ ফুটপাতের ধারে অনেক খাবার দোকান সকালে বসেছিল ৷ গিয়ে দেখি খদ্দের উপচে পড়ছে ৷ ওপারে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ ভবন ৷ তার পিছনে ভূতত্ব এবং উদ্ভিদতত্ব বিভাগ ক্যাম্পাস এবং কার্জন হল ৷ আসলে অদূরের শাহবাগ থেকে কী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বা বইমেলা প্রাঙ্গণ সব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাভুক্ত ৷ এই বিশ্ববিদ্যালয় তো কম বড় নয় ৷ শিক্ষাঙ্গন মোট ২৩ টি। মূল আয়তন ২৬০ একরেরও বেশি ৷ তাছাড়া গোটা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কত যে ছোট ছোট শাখা আছে বলার নয় ৷ শুধু কী আয়তনে ? ভাষা আন্দোলন থেকে বাহাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, এমন কী পরবর্তী সময়ে যে কোন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান আরও বৃহৎ ৷ একটি কথা আছে “আরম্ভেরও আরম্ভ থাকে ৷” ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের বহু পূর্বে সেই আরম্ভের সলতে জ্বালিয়েছিল এই ঐতিহ্যশালী প্রতিষ্ঠানটি ৷ মূলত ১৯২৬, ১৯২৭, ১৯৩৬ সালে যথাক্রমে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম এবং কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রকে সম্বর্ধনা দেওয়ার ভিতর যে উদ্ভূত আবেগ বাঙালী মুসলিম ছাত্র শিক্ষকদের মনে গভীর রেখাপাত করে যা পঞ্চাশের দশকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলনের পটভূমি প্রস্তুত করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে ৷ এছাড়া আরও একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, ১৯৪১ এর জুলাই মাসে কবিগুরুর মৃত্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়, তার মধ্য দিয়ে বাংলাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারী ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবী উচ্চারিত হয় ৷ এরপর তো শুধুই মাতৃভাষা অধিকারের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস ৷ ভাষা আন্দোলনে বাংলাদেশের যে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ অগ্রণী শক্তি ছিল, তার আতুঁড়ঘর এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ‘রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ ৷

চা-পান করার ফাঁকে কার্জন হল বাস স্টপের কাছে গাছগাছালি ঘেরা একটি জায়গা আমার চোখ টেনে নিল ৷ ভাবলাম পুরোনো স্থাপত্যের কোন মসজিদ হবে ৷ ওটি ছিল মুসা খাঁ মসজিদ ৷ প্রাক-মুঘল স্থাপত্যের একটি নিদর্শন ৷ এলাকাটির আগে নাম ছিল বাগ-এ-মুসা খাঁ। এটি বারো ভূইয়াঁর অন্যতম ভূইয়াঁ ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁয়ের নামে নামাঙ্কিত করা হয় । মুসা খাঁ সুবেদার ইসলাম খাঁয়ের নিকট যুদ্ধে হেরে যাবার পর যুদ্ধাবন্দী হিসেবে আটক ছিল। কিছুটা অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছে মুসা খাঁ নির্মিত মসজিদটি ৷ পাশের সমাধিটি স্বয়ং মুসা খাঁর ৷

‘পারলে অবশ্যই শহীদুল্লাহ হল পুকুর ঘুরে আসবেন।’ গতকাল ফোন করেন কবিবন্ধু মোহাম্মদ শাহানুর ইসলাম ৷ এটি ওই মুসা খাঁ মসজিদের পিছনে কার্জন হলের খুব কাছে ৷ বিখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মৃত্যুর পর ১৭ জুন, ২০১৭ সালে প্রাচীন লাইটন হল তথা পরবর্তী সময়ে ঢাকা হলটির নতুন নামকরণ হয় ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল ৷ হলের সামনে সেই বহুশ্রুত পুকুরটি ৷ একসময় বিশাল আকার ছিল ৷ কিছুটা মজে গেছে ৷ ১৯৫২ সালে এই পুকুর ঘাটে বসেই ১৪৪ ধারা ভেঙে ভাষা আন্দোলনের মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে এই হলের পাশেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। যার ফলে ক্ষিপ্ত পাক সেনারা সর্বপ্রথম হত্যাকাণ্ডটি চালায় এই হলে ঢুকে । খুন হন এ হলের আবাসিক শিক্ষক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের আতাউর রহমান খান খাদিম সহ আরো অনেকে ৷ এ’রকমই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছত্রে ছত্রে রয়েছে বাঙালি জাতির প্রতিরোধের ইতিহাস, বীরত্বের গাঁথামালা ৷

গতকাল বিকালে দেখেছিলাম অপূর্ব স্থাপত্যের জগন্নাথ হল ৷ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম যে তিনটি হল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জগন্নাথ হল তার একটি। ঢাকার বলিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল চৌধুরীর পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে এই হলের নামকরণ করা হয় ৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব ও অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হত্যা করে। আর ৭১’র কুখ্যাত ২৫ মার্চ গভীর রাতে বহু আবাসিক ছাত্র এবং কর্মচারীদের নৃশংস খুন করে পাক হানাদারবাহিনী ৷ ভাষা শহীদ মঞ্চে আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল ৫২’র ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলির কথা ৷ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ২১ ফেব্রুয়ারী ছাত্রছাত্রীর দল দশজন করে জগন্নাথ হলের দিকে এগোচ্ছিল ৷ প্রথমে দলটি ছিল ছাত্রীদের ৷ এই সময় পুলিশ হঠাৎই লাঠি চার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়তে শুরু করে ৷ তারপরই কোনরকম হুঁসিয়ারী না দিয়ে গুলি চালায় ৷ প্রথম ঝাঁকের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় জব্বার ও রফিক ৷ পরের গুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত ৷ শহরের অন্যত্রও গুলি চলে ৷ মৃত্যুবরণ করেন মোট আটজন এবং বুলেটবিদ্ধ হয় ১০০ জন ৷ ভাষাশহীদের রক্তে সেদিন গোটা ঢাকা পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল ৷

পেটে দানাপানি পড়ার পর মনে হল প্রতিবছর কি আর বাংলাদেশ অাসতে পারব ! যাই না কেন আর আবার শহীদ মঞ্চে ৷ তাছাড়া শহীদবেদীর মাটি সংগ্রহ করতেও বেমালুম ভুলে গেছি ৷ আর এ’সময়ই এমন দুটি ঘটনা ঘটল, যা মনে রাখার মতন ৷ সেই সুদূর আমার রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার চন্দননগর থেকে আটজন সাইকেল আরোহী কবি আবদুল গফ্ফর চৌধুরীর লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি গাইতে মূল শহীদ মিনারের দিকে দৃপ্ত ভঙ্গীতে এগিয়ে চলেছে ৷ ওদের সাথে প্রতিবন্ধী এক ভাষাপ্রেমী ৷ মাতৃভাষার প্রতি অমোঘ আকর্ষণে শারীরিক প্রতিকূলতা তুচ্ছ হয়ে গেছে ৷ ওদের সংগে দুই কদম না এগোলে চলে ?

কিন্তু তার আগে বাকী যে ঘটনাটি ঘটল, হয়ত সেটি বাংলাদেশের মাটিতে বলেই সম্ভব হয়েছিল ৷ দ্বিতীয়বার যখন রফিক স্মৃতিসৌধ পার করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে যাচ্ছি, উস্কোখুস্কো চুল এবং অবিন্যস্ত চেহারা দেখে প্রহরারত বাংলাদেশের পুলিশ আটকালো ৷ ভারত থেকে আসছি বলার পর ভাবলাম পার্সপোট দেখতে চাইবে ৷ কিন্তু আদতে তা ঘটল না ৷ সুদর্শন তরুণ এক পুলিশ অফিসার বললেন, ‘দুজন ভাষা শহীদের নাম বলুন দেখি ৷’ এ কী, পুলিশ নাকি ছোটবেলাকার স্কুলের মাষ্টারমশাই ? অপ্রস্তুত অবস্থায় কয়েকটি নাম বলার পর যখন ওরা জানল, কবি হিসাবে এ অভাগার আরও একটি পরিচয় আছে, মুহূর্তে কঠোর মুখগুলি হাসিখুশীতে ভরে গেল ৷ এই দেশে কয়েকদিন হল পদার্পণ করেছি ৷ অনুভব করেছি ট্রেন, বাস,রাস্তাঘাটে যখনই মানুষেরা জেনেছেন আমরা সাহিত্যের সংগে যুক্ত, তাদের অন্তরের গভীরস্থল থেকে শ্রদ্ধা, সম্মান উদ্বেলিত হয়েছে ৷ গতকাল রাতে একুশে ভাষাদিবস নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম ৷ তার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করলাম ৷ জীবনের এই বিরল মূহুর্তে আমি তখন ভি আই পি ৷ দু’তিনজন মোবাইলে আবৃত্তি আপলোড করতে লাগল ৷ পুলিশ ব্যারিকেডে এভাবে কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা বোধহয় জীবনে আর পাব না ! বাংলাদেশের এই পুলিশ সম্প্রদায় একদা মুক্তিযুদ্ধের সময় অর্থ, প্রোমোশন, লোভ সব স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে হাজারে হাজারে শহীদ হয়েছিল ৷ করোনাজনিত লকডাউনে বহু নিরন্ন দীনদরিদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে ওরা যে বর্তমানে প্রতিনিয়ত জীবনের জয়গান গাইছে, বলার অপেক্ষা রাখে না ৷

রিক্সাওয়ালার ডাকে চমক ভাঙল, ‘দাদাবাবু, ভাড়াটা দিয়ে আমায় ছাড়েন ৷ আরও সওয়ারী আছে ৷’ এগিয়ে চললাম ভীড় ঠেলে বইমেলার দিকে ৷

তথ্যসূত্র : একুশে ফেব্রুয়ারী ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত, ১৯৯১
চলবে…

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com