August 4, 2020, 11:33 pm

নদীর রাহুগ্রাস

নদীর রাহুগ্রাস

Spread the love

মৃণাল চৌধুরী সৈকত

এ্যাইহানে,
এ্যাইহানে বসতি ছিলো মানুষের
আজ আর কেউ নেই
কেউ না,
নদীর ভাঙ্গন দ্যাইখ্যা দ্যাইখ্যা
দিশেহারা মানুষগুলো পালাইতে থাহে
কেউ ওই পাড়ে,
কেউ দিগ্বিদিগ।
বুকের ভেতরটা খাঁ কইরা ওঠে
চমকাইয়্যা ওঠে হারাধন,
বুক ফাইট্যা কান্না আইতে চায়,
বুকে পাথর বাঁধে, কষ্টের পাথর।
নদীর ভাঙ্গন দ্যাইখ্যা দ্যাইখ্যা
বুঝি, বাবলার কাঁটার মতো
একটা অজানা ভয়
হারাধনের বুকে আইস্যা বিঁধে,
কোন রাঁ নেই তার মুহে।
দুমড়াইয়্যা মুচড়াইয়্যা হগল কিছু
ভাসাইয়্যা নেয় নদী,
নদীর ঘোলা শ্রেুাত
তার মগজের কোঁষে কোঁষে
ঢুইক্যা পড়ে,
দিন যায়—-
কখন যে রাইত নাইম্যা আসে
ঠের পায় না হারাধন।
ঘুটঘুটে অন্ধকার-
বারান্দার খুটিতে হেলান দিয়া
তাকাইয়্যা থাহে,
আকাশের দিকে, নির্বাক।
হঠাৎ, হারাধনের কাঁধ আকড়াইয়্যা ধইরা
প্রবল ঝাঁকি দেয় অনিতা ।
এ্যাই, এ্যাইহানে বইস্যা আছো ক্যা ?
সম্বিত ফিরে পায় হারাধন,
চাপা কান্নার আওয়াজ
বড় বিশ্রী ঠেহে তার কানে।
আরে অই-কান্দস ক্যা
কাইন্দ্যা আর কি অইবো ?
হারাধন, হঠাৎ নিজের মধ্যে
এক ধরনের কাঁপন অনুভব করে
কোন কথা কইতে পারে না সে ।
মাঠির মুর্তির মতো
চুপচাপ বইস্যা থাহে।
এরই মধ্যে বাড়ির পোষা কুকুরডা
বিলাপ তোলে-করুন বিলাপ,
হারাধনের তন্দ্রা কাইট্যা আসে।
চোখের পাতা খুইল্যা তাকায়
নিশ্চিদ্র অন্ধকার,
আবারো কাঁধে হাত রাইখ্যা
মৃদু নাড়া দেয় অনিতা-
আর বলে,
চলো ঘরে ফিইরা চলো।
কে ? চমকাইয়্যা ওঠে হারাধন ।
বুক ফাইট্যা কাঁন্না আহে অনিতার !
পঁচিশ বছর ঘর করার পর-
আজ কিনা হারাধন
তার পরিচয় জানবার চায় !
ভাবতে থাহে অনিতা,
তাইলে কি —–
পঁচিশ বছরের তিলতিল কইরা
সাঁজানো জীবন, সংসার-সব
এলোমেলো হইয়্যা পড়লো ?
কতবার কইছি,
জমি-জমা সব বেইচ্যা চল,
ওই পাড়ে চইল্যা যাই,
এ্যাইহানে থাইক্যা কুনু লাভ নাই,
আমার কথা হুনল না.
অহন বুঝুক, যন্ত্রনা কারে কয় ?
একবার নদীর ভাঙ্গন,
আরেকবার চর দখলের লড়াই
তার উপর হারা বছর
নানা ছুঁতায়,
ওইসব মানুষ গুলাতো
পিছে লাইগ্যা রইছেই।
এতো জ্বালা লইয়্যা,
মানুষ বাঁচবার পারে ?
এই ভাবে, আর কত দিন
নদীর সাথে মাইনষের সাথে
জেদ কইরা, মাঠি কামরাইয়্যা
পইড়্যা থাকবা,
কতো আর কত দিন ?
চলো অহনো সময় আছে।
তোমার চারপাশে চাইয়্যা দ্যাহ
হারা গেরামের মানুষগুলা
একে একে হগলে চইল্যা যাইতাছে,
এ্যাইহানে থাইক্যা কারে লইয়্যা-
কারে লইয়্যা, সমাজ করবা ?
তোমার-আমার কথা না অয়
বাদ দিলাম,
মাইয়্যাডার কথা একবার ভাইব্যা দ্যাহ ?
মাইয়্যাডা বড় অইতে না অইতেই
ওই গেরামের পোলারা
তার পিছে লাগছে !
ঘটনা একহান ঘটলে-তহন বুঝবা।
কথাডা হুইন্যা,
হুংকার দিয়া দাঁড়াইয়্যা ওঠে-হারাধন,
কি কইল্যা-কি কইল্যা অনিতা ?
অবশেষে কিনা—না—না
আমি আর চুপ কইরা থাহুম না।
তুমি খাঁটি কথাই কইছো,
সামান্য একটা ছুঁতা পাইলেই
ওরা যা খুশি তাই কয়,
এ্যাইহানে পইড়্যা আছস ক্যা ?
যা তোর বাপেগর দেশে চইল্যা যা,
হের উপর মালাউনের বাচ্চা, চাড়াল
যত্বো সব অকথ্য গালিগালাজ।
এ্যারই মধ্যে ঢেউ আচঁড়ে পড়া
আর নদীর পাড় ভাঙ্গার
ঝুপঝাপ শব্দের তীব্রতা বাড়ে,
হারাধন বিদ্যুতের মত চমকাইয়্যা ওঠে
এদিক ওদিক তাকায় আর ভাবে,
ঘাঁড় ঘুরালেই বুঝি দেখতে পাবে,
বাড়ির পাঁশ ঘেঁষে
তীব্র বেগে বয়ে চলছে নদী।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে-
অন্ধকারে মাথা নাড়ে হারাধন,
এ্যাই দেশ ছাইড়্যা চইল্যা যাইতে
আমার বড় কষ্ট অয়-রে অনিতা।
কথাগুলো বলতে বলতে
কেঁদে ফেলে হারাধন,
তার কান্নার জলে নদীর ভাঙ্গন আর
দেশ ভাঙ্গন এক হয়ে যায়, সত্যি,
মানুষের কাছে নদী যেন অপ্রতিরোধ্য।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com