August 4, 2020, 11:28 pm

সনেট নির্জন স্টেশনে একদিন

সনেট নির্জন স্টেশনে একদিন

Spread the love

মৃণাল চৌধুরী সৈকত

ইজ্জতপুর রেল স্টেশনটা এমনিতেই ছোট্রো
তার উপর সন্ধ্যা নামলেই,
রঙ্গিন কেরোসিনের বাতি জ্বলে সেখানটায়,
চারপাশে সারি সারি আমলকির গাছ
আর প্লাটফর্মটায় নিঝুম অন্ধকার যেন
এমনিতেই ঝুলে ঝুলে দোল খায়।
অদুরে, হেমন্তের সাদাকুয়াশার ভিতর দিয়ে
আউটার সিগন্যালের লাল ঝলমলে
আলো-আকাশ প্রদীপের মতো জ্বলছে ।
মৃণাল টিকিট কাটতে গিয়ে জানল
টঙ্গী যাওয়ার গাড়ী সন্ধ্যে সাতটা চল্লিশে,
কিচ্ছু যায় আসে না মৃণালের।
তারপর, টিকিট কেটে গাড়ীর অপেক্ষা
প্লাটফর্মটার উত্তর দিকটায়
নির্জনে বেঞ্চের এক প্রান্তে বসে ভাবছে,
আমি আর কোথাও যাব না
আমার রাত নেই, দিন নেই
কি যে অসহ্য যন্ত্রনা, উহ।
হঠাৎ পাশ থেকে একজন
অপরিচিতা……..
অঃ কোথায় যাবেন আপনি ?
মৃঃ কেন বলুন তো ?
অঃ না মানে জানতে ইচ্ছে…….
মৃঃ আপনি কী এখানকার লোক ?
অঃ না।
মৃঃ তবে, আপনি কোথাকার লোক ?
অঃ এখানে বুঝি কাজে এসেছেন ?
মৃঃ না।
অঃ তাহলে।
মৃঃ আচ্ছা পৃথিবীর সব আলো নিবে
অন্ধকার কেন, বলতে পারেন ?
অঃ তার মানে ?
মৃঃ আপনি কী উৎসবের শেষে
কোথাও, লন্ডভন্ড বাড়ি দেখেছেন ?
অঃ কী বলছেন আপনি ?
মৃঃ কতগুলো হাঁড় মাংস নিয়ে
নেড়ি শিয়াল কুকুরের খেয়োখেয়ি,
আমার ভিতরটা তেমনি এক
উৎসব শেষের লন্ডভন্ড বাড়ি।
হঠাৎ তটস্থ হয়ে বেঞ্চ থেকে
সোজা হয়ে দাঁড়ালো মৃণাল
তারপর, আচ্ছা আপনি কে ?
আপনি এখানে কেন, নাকি ?
জবাবটা এল খানিকটা পরে।
অঃ ডিউটি করছি।
মৃঃ ডিউটি ! ওঃ, তাই বলুন !
তা কীসের ডিউটি ? রেলের ?
অঃ না।
মৃঃ এতো রাতে, তা হলে ?
অঃ নজর রাখছি।
মৃঃ নজর রাখছেন ? কী আশ্চর্য় !
অঃ হ্যাঁ।
মৃঃ কার ওপর ? এখানেতো কেউ—
অঃ আপনি আছেন।
মৃঃ আমি ! আ-মি ! আপনি কী
আমার ওপর নজর রাখছেন ?
অঃ হ্যাঁ, আপনার ওপর।
মৃঃ কিন্তু কেন ?
অঃ ওটাই আমার ডিউটি।
মৃঃ সত্যি বলুন, আপনি কে ?
অঃ চিনবেন না।
মৃঃ কে আপনাকে আমার ওপর
নজর রাখতে বলেছে, বলুন ?
অঃ ডিউটি।
মৃঃ ডিউটি ! মানেই হয় না।
কিসের ডিউটি ? কার ডিউটি ?
অঃ ডিউটি শুধু ডিউটিই।
মৃঃ আপনি বললেন নজর রাখছেন
সেতো ভাল কথা, কিন্তু !
অঃ বলুন ?
মৃঃ নজর রাখতে গিয়ে আমাকে
ফাঁসিয়ে দেবেন না তো ?
অঃ তা জানি না, আমাকে শুধু
নজর রাখতে বলা হয়েছে।
মৃঃ কে বলেছে ?
অঃ জানি না !
মৃঃ জানেন না ? না ইচ্ছে করে
আমাকে আপনি বলতে চাইছেন না ?
অঃ জানলে বলতে পারতাম।
মৃঃ কবে থেকে নজর রাখছেন ?
অঃ প্রথম থেকে।
মৃঃ প্রথম বলতে ?
অঃ জন্ম থেকে।
মৃঃ আর্শ্চয ! জন্ম ! সে কী !
অঃ আমি আপনি একই সঙ্গে জন্মেছি।
মৃঃ আপনি আসলে কে, পরিচয়টা দিন ?
অঃ বলেছি তো, আমাকে চিনবেন না।
মৃঃ আচ্ছা, আপনি কী আমাকে চেনেন ?
অঃ নিশ্চয়ই।
মৃঃ তাহলে বলুন তো আমি কে ?
অঃ মৃণাল চৌধুরী।
মৃঃ আর্শ্চয ! আমার বাড়ি কোথায় ?
অঃ টঙ্গী।
মৃঃ আমার বাবার নাম কী ?
অঃ মাখন রায় চৌধুরী।
মৃঃ আপনি আমার হবু স্ত্রীর নাম—
অঃ জানি। চৈতি চৌধুরী।
মৃঃ আপনি জানেন, আমার হবু স্ত্রী
আমাকে ভালবাসে না, অন্যকে বাসে !
অঃ জানি।
মৃঃ আপনি দেখছি আমার সবই জানেন !
কিন্তু আমি যে আপনার কিছুই….
অঃ জানেন না।
মৃঃ আপনি আমার সঙ্গেই জন্মে ছিলেন ?
অঃ হ্যাঁ।
মৃঃ আপনার গ্রামের বাড়ি কোথায় ?
অঃ কোথাও নয়।
মৃঃ তাহলে ?
অঃ আপনি যেখানে আমিও সেখানে।
মৃঃ বেশ বললেন তো আপনি, কিন্তু !
আমি আজই আপনাকে প্রথম দেখলাম ?
অঃ দেখলেন ?
মৃঃ হ্যাঁ, তো ! এই যে দেখছি !
অঃ দেখছেন না। অনুমান করছেন।
মৃঃ তাহলে আপনি কী বাস্তব নন ?
অঃ বাস্তব
মৃঃ রিয়েল
অঃ রিয়েল
মৃঃ আমি আপনাকে ছুঁয়ে দেখতে পারি ?
অঃ না।
মৃঃ সে কী ! কেন বলুন তো ?
অঃ ছোঁয়া যায় না বলে।
মৃঃ আপনি জাদুকর নন তো ?
অঃ না।
মৃঃ তাহলে কী কোন গোয়েন্দা ?
অঃ না, তাও নয়।
মৃঃ আচ্ছা, আপনি কী আমার
ভারাক্রান্ত হৃদয়ের কথা জানেন ?
অঃ আমি বলেছি তো, আমি
আপনার সব কিছু জানি।
মৃঃ তাহলে আপনার কাছেই সব কথা
বলা যায়, কী যায় না ?
অঃ আপনার ইচ্ছে হলে যায়।
মৃঃ বড় গ্লানি, বড় অপমান,
পালিয়ে বেড়াচ্ছি, ঘুরে মরছি
তবুও তো ভুলতে পারছিনা।
শুনেছি সময়ের প্রলেপে নাকি
সবকিছু ঢাকা পড়ে যায়,
কই যাচ্ছে না তো ?
অঃ কী ভুলতে চান ?
মৃঃ অপমান, গ্লানি, অনুশোচনা সব-সব
ভুলতে চাই আমি, পারছি না,
বুকের মধ্যে জ্বালা, সহ্য হচ্ছেনা ?
অঃ জানি।
মৃঃ কী করব এখন ?
অঃ জানি না।
মৃঃ যদি আত্বহত্যা করতে চাই ?
অঃ একটা মেয়ের জন্য ?
মৃঃ হ্যাঁ ?
অঃ একটা তুচ্ছ মেয়ের জন্য ?
মৃঃ ধরুন, তাই।
অঃ একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল ?
মৃঃ শুনছেন ?
অঃ শুনছি।
মৃঃ আজ রাতটি বড্ড মনোরম
ভুতুরে, অন্ধকার, রহস্যময় কুয়াশা
ভুতুরে এই স্টেশন, আর
প্রেতলোক থেকে আসা আপনি
এইসব আমাকে প্ররোচিত করছে,
মরার জন্য, মরলেই শেষ,
সব শান্তি, সব সমাধান।
অঃ আবারো একটা দীর্ঘশ্বাস
মৃঃ সাতটা চল্লিশে ট্রেন আসবে, এত
দেরি করছে কেন, বলুন তো ?
অঃ ট্রেন আসবে, নিশ্চয়ই আসবে।
মৃঃ চলন্ত ট্রেনের চাকায় যদি
নিজেকে সমর্পন করে দেই ?
অঃ কোন জবাব নেই।
মৃঃ আপনি কি আছেন ?
অঃ আছি।
মৃঃ আপনি কী সব সময়
আমার সঙ্গে-সঙ্গেই থাকেন ?
অঃ থাকি।
মৃঃ লাইনের ওপর দিয়ে ওটা
কী আসছে বলুন তো !
অঃ একটা ট্রেন।
মৃঃ ট্রেন ! ট্রেন আসছে কেন ?
অঃ শুধু, আপনার জন্য।
মৃঃ দুর ? কী যে বলেন ?
হঠাৎ ট্রেনটা সামনে এসে দাঁড়াল ।
অঃএইযে, ট্রেন এলো উঠে পড়–ন।
ভারী মজা পেল মৃণাল চৌধুরী
ট্রেনে সে জীবনে কখনও ওঠেনি
আজ উঠবে, খুবই আর্শ্চয ঘটনা,
মৃণাল চলতি ট্রেনে উঠে পড়ল,
সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনটা, অজানা উদ্দ্যেশে
দ্রুত গতিতে ছুটতে শুরু করল
কোথায় যাচ্ছে নিজেও জানে না।
এক সময় সে ঘরে ফিরে
তার নিজেরই সাঁজানো গোঁছানো ঘর।
ঘরে ড্রীম লাইটের আলো জ্বলছে,
ভারী সুন্দর মুখশ্রীর একটা মেয়ে
খাটে বিছানা পাঁতছে, বাঁলিশ সাঁজাচ্ছে।
তাকে দেখে খুশির হাসি হেসে?
মেয়েটি বলল, তুমি এসে গেছ ?
মৃঃ চৈতি, তুমি !
চৈঃ দেরি দেখে যা ভাবনা হচ্ছিল ?
মৃঃ কিন্তু, আমাকে নিয়ে হঠাৎ তোমার—
চৈঃ আচ্ছা, হঠাৎ আবার ও কথা ?
কত বার বলেছি তোমাকে,
ও আসলে আমাকে চায়নি
চেয়েছিল, দুদিন ফুর্তি করে
আমাকে রেখে কেঁটে পড়তে।
এজন্যই, আমি ওকে আমার
শরীর ছুঁতে দিইনি কখনো,
পালিয়ে গেছি টঙ্গী থেকে
ইজ্জত পুরে, মামার বাড়িতে।
মামাও তো তোমাকে বলেছে
কী বলেনি ?
তবে কেন আজো বিশ্বাস করো না ?
আবেগ ভরে কী যেন একটা
বলতে চেয়েছিলো মৃণাল চৌধুরী।
কিন্তু, আঁচমকা ছবিটা মুছে গেল
বামপাশ থেকে প্রেতনীর শ্বাসের মতো
একটা গরম বাতাস বয়ে এলো,
শুধুই আত্বচিৎকার আর হাহাকারের শব্দ।
অন্ধকার প্ল্যাটফর্মে বসে আছে মৃণাল।
মৃঃ এটা কী সত্যি ?
অঃ কে জানে ?
মৃঃ তবে দেখলাম কেন ?
অঃ একটা কিছু হতেও পারে তো !
মানুষের জীবনেই তো স¤া¢বনা থাকে !
মৃঃ আবার মিথ্যেও তো হতে পারে !
অঃ পারে।
মৃঃ আচ্ছা, কোনটা সত্যি-কোনটা মিথ্যে
সেটা আমি, বুঝব কী করে ?
অঃ অপেক্ষা করা যাক।
মৃঃ অপেক্ষা ?
অঃ হ্যাঁ-অপেক্ষা।
দুর থেকে একটা ঝলমলে আলো
এসে পড়ল রেললাইনের ওপর।
প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ল সেই আলো।
মৃণাল দেখল বেঞ্চে কেউ নেই,
কেউ হয়তো ছিলই না সেখানে।
এ যেন প্রেমিক জীবনের খোয়াব।
মৃণাল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল,
ট্রেন আসছে, সাতটা চল্লিশের ট্রেন।।
সমাপ্ত


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com